|

৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৫ম পরিচ্ছেদ – প্রবন্ধ


৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৫ম পরিচ্ছেদ: প্রবন্ধ হলো গদ্যে লিখিত এমন রচনা, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণাকে পরিতৃপ্ত করা। তাই বলে তথ্যবহুল রচনা হলেই তাকে প্রবন্ধ সাহিত্যের উদাহরণরূপে গণ্য করা চলবে না, যদি না লেখাটি সাহিত্য পদবাচ্য হয়। সাহিত্যের প্রধান লক্ষণ সৃজনশীলতা। লেখকের সৃজনীশক্তির কোনো পরিচয় যদি পরিস্ফুটিত না হয়, তো তেমন কোনো লেখাকে প্রবন্ধ সাহিত্যের লক্ষণযুক্ত বলা চলবে না।


‘বাংলা নববর্ষ’ প্রবন্ধটির প্রাসঙ্গিক আলোচনা

লেখক সম্পর্কিত তথ্য: শামসুজ্জামান খানের জন্ম ১৯৪০ সালে এবং মৃত্যু ২০২১ সালে। প্রবন্ধ রচনায় ও লোকসাহিত্য গবেষণায় তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘ফোকলোর চর্চা’, ‘বাংলা সন ও তার ঐতিহ্য’, ‘গ্রামবাংলার রঙ্গরসিকতা’ ইত্যাদি।

মূলবক্তব্য: বাংলা নববর্ষ বাঙালির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নববর্ষের প্রেরণাও সক্রিয় ছিল। কারণ, পাকিস্তানিরা বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ উদযাপনে বাধা দিয়েছিল এবং এর প্রতিবাদে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি। ধরে নেওয়া হয় সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা সনের গণনা আরম্ভ হয়। পরে জমিদার ও নবাবেরা নববর্ষে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।

নববর্ষে হালখাতা, বৈশাখী মেলা, ঘোড়দৌড়, বিভিন্ন লোকমেলার আয়োজন করে সাধারণ মানুষ এ উৎসবকে প্রাণে ধারণ করেছে। পাহাড়ি অবাঙালি জনগোষ্ঠী বৈসাবি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে আমরাও নববর্ষ উৎসব ব্যাপকভাবে উদযাপন করি এবং বর্তমানে এই উৎসব বাঙালির জীবনে এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

পাঠ বিশ্লেষণ

পাঠের উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ পড়তে, বুঝতে ও লিখতে পারদর্শী করে তোলা।
নামকরণ: পরিচ্ছেদটি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রবন্ধ লেখা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে। এরই অংশ হিসেবে পরিচ্ছেদটিতে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। সে বিবেচনায় রচনাটির নাম ‘বাংলা নববর্ষ’ নামকরণ সার্থক হয়েছে।.
রূপশ্রেণি: ‘বাংলা নববর্ষ’ একটি প্রবন্ধ।


প্ৰবন্ধ

প্রবন্ধ হলো গদ্যে লিখিত এমন রচনা, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণাকে পরিতৃপ্ত করা। তাই বলে তথ্যবহুল রচনা হলেই তাকে প্রবন্ধসাহিত্যের উদাহরণরূপে গণ্য করা চলবে না, যদি-না লেখাটি সাহিত্য পদবাচ্য হয়। সাহিত্যের প্রধান লক্ষণ সৃজনশীলতা। লেখকের সৃজনীশক্তির কোনো পরিচয় যদি পরিস্ফুটিত না হয়, তো তেমন কোনো লেখাকে প্রবন্ধসাহিত্যের লক্ষণযুক্ত বলা চলবে না।

এ কারণে খবরের কাগজে প্রকাশিত সমস্ত লেখাই গদ্যে রচিত হলেও সেগুলোকে প্রবন্ধসাহিত্যের নমুনা হিসেবে বিবেচনা করা সংগত নয়। তাহলে তো জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত সকল রচনাই প্রবন্ধসাহিত্য বলে গণ্য হতে পারত। তা না হওয়ার কারণ ঐ সৃজনশীলতার অভাব। অর্থাৎ প্ৰবন্ধ হলো এক ধরনের সুবিন্যস্ত গদ্য রচনা। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ রচিত হয়; যেমন- ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম, খেলাধুলা ইত্যাদি।

পাঠ্যবইয়ের ‘পিরামিড’ লেখাটি ইতিহাস বিষয়ক, ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ লেখাটি বিজ্ঞান বিষয়ক, ‘কত কাল ধরে’ লেখাটি সমাজ-বিষয়ক এবং ‘বাংলা নববর্ষ’ লেখাটি সংস্কৃতি-বিষয়ক। যিনি প্রবন্ধ লেখেন, তাঁকে বলা হয় প্রাবন্ধিক বা প্রবন্ধকার। প্রবন্ধের মধ্যে সাধারণত আবেগের চেয়ে যুক্তি প্রাধান্য পায়। বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদে প্রাবন্ধিক তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। প্রবন্ধের প্রথম অংশ ‘ভূমিকা’ নামে পরিচিত। ভূৈমিকায় মূল আলোচনার ইঙ্গিত থাকে। প্রবন্ধের শেষ অংশ ‘উপসংহার’ নামে পরিচিত। উপসংহারে প্রাবন্ধিকের সমাপ্তিসূচক মন্তব্য থাকে।

প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রবন্ধ রচনার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়-
১. প্রবন্ধ মননশীল সাহিত্য। তাই প্রবন্ধের মধ্যে সাধারণত আবেগের চেয়ে যুক্তি প্রাধান্য পায়।
২. প্রবন্ধ সাহিত্যে মানুষের চিন্তা, মনন ও তত্ত্বই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। প্রবন্ধ মস্তিষ্কপ্রসূত রচনা। তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি, তর্ক, সিদ্ধান্ত প্রবন্ধের প্রধান উপকরণ।

৩. সাধারণত প্রবন্ধ সাহিত্যে জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পেয়ে থাকে।
৪. কোনো বিষয় সম্পর্কে লেখকের চিন্তাগ্রাহ্য তত্ত্বকে কেন্দ্র করে প্রবন্ধ গড়ে ওঠে।
৫. বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদে প্রাবন্ধিক তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন।
৬. প্রবন্ধের প্রথম অংশ ‘ভূমিকা’ নামে পরিচিত। ভূমিকায় মূল আলোচনার ইঙ্গিত থাকে।
৭. প্রবন্ধের শেষ অংশ ‘উপসংহার’ নামে পরিচিত। উপসংহারে প্রাবন্ধিকের সমাপ্তিসূচক মন্তব্য থাকে।

প্রবন্ধের শ্রেণিবিভাগ

প্রবন্ধকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যথা— ক. তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ। খ. মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ।
ক. তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ: যে প্রবন্ধের মধ্যে বিষয়বস্তুর প্রাধান্য লক্ষণীয় থাকে তাকে তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ বলে। এই বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের নানা উপভাগ রয়েছে সেগুলো হলো-

১. বিবরণমূলক প্রবন্ধ: বিবরণমূলক প্রবন্ধে কোনো বিষয়ের বিবরণ দেওযা হয়।
২. বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ: বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধে তথ্য ও উপাত্তের বিশ্লেষণ করা হয়।
৩. তথ্যমূলক প্রবন্ধ: তথ্যমূলক প্রবন্ধে মূলত তথ্য তুলে ধরা হয়।

৪. চিন্তামূলক প্রবন্ধ: বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচিতি নির্ণয় করাই হলো এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
৫. বিতর্কমূলক প্রবন্ধ: এই প্রবন্ধের মাধ্যমে মতবাদের বিশ্লেষণ, পক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তিগুলো আলোচনা করা হয়।
৬. নীতিকথামূলক প্রবন্ধ: প্রচলিত নীতিকথা এই প্রবন্ধে স্থান লাভ করে।

খ. ব্যক্তিগত বা মন্ময় প্রবন্ধ: ডাবনিষ্ঠ বা মন্ময় প্রবন্ধকে ব্যক্তি প্রবন্ধ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এ ধরনের প্রবন্ধে লেখক বিষয় অপেক্ষা পাঠককেই বেশি গুরুত্ব দেন। নিজের অনুভূতিকে পাঠকের অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করতে চান। বলা যায়, এ-জাতীয় প্রবন্ধে লেখকের ব্যক্তিসত্তার ‘আত্মপ্রকাশ ঘটে।

প্রবন্ধ লেখার কৌশল

১. প্রবন্ধের বিষয় স্থির করার পর তার উপকরণ ও তথ্য প্রস্তুত করতে হবে।
২. প্রবন্ধের মধ্যে সাধারণত তিনটি অংশ থাকে। প্রবন্ধটি এই তিনটি অংশে সাজাতে হবে। যথা— ১. সূচনায় বিষয়বস্তুর আভাস, ২. মূলবক্তব্যে পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত এবং ৩. উপসংহারে সমাপ্তিসূচক মন্তব্য।
৩. প্রবন্ধ লিখতে হবে সহজ-সরল ভাষায়, সংক্ষেপে, ছোটো অনুচ্ছেদ অনুযায়ী।

৪. প্রবন্ধের শুরুতে লিখতে হবে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলো।
৫. বিষয় অনুযায়ী যুক্তি ও তথ্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। পরস্পরবিরোধী যুক্তি ও ভাব রচনায় স্থান পাবে না।
৬. প্রবন্ধ রচনায় সাধু ও চলিত ভাষায় মিশ্রণ পরিহার করতে হবে।
৭. প্রবন্ধের বিষয় যেন খুব বেশি বড়ো বা ছোটো না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

পাঠ মূল্যায়ন

প্রশ্ন-১. কোন ধরনের সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য থাকে পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণাকে পরিতৃপ্ত করা?
উত্তর: প্রবন্ধ।

প্রশ্ন-২. সাহিত্যের প্রধান লক্ষণ কী?
উত্তর: সৃজনশীলতা।

প্রশ্ন-৩. খবরের কাগজে প্রকাশিত লেখাকে প্রবন্ধ বলা যায় না কেন?
উত্তর: সৃজনশীলতা থাকে না বলে।

প্রশ্ন-৪. যিনি প্রবন্ধ লেখেন, তাঁকে কী বলা হয়?
উত্তর: প্রাবন্ধিক বা প্রবন্ধকার।

প্রশ্ন-৫. প্রবন্ধের মধ্যে সাধারণত কী প্রাধান্য পায়?
উত্তর: যুক্তি।

প্রশ্ন-৬. প্রবন্ধের মধ্যে সাধারণত কয়টি অংশ থাকে?
উত্তর: তিনটি।

প্রশ্ন-৭. বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধের আরেক নাম কী?
উত্তর: তন্ময় প্রবন্ধ।

প্রশ্ন-৮. ব্যক্তিগত প্রবন্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় কোন প্রবন্ধকে?
উত্তর: মন্ময় প্রবন্ধকে।


 ‘বাংলা নববর্ষ’ প্রবন্ধটি নিজের ভাষায় বলো এবং লেখো।

নববর্ষ একটি সর্বজনীন উৎসব। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ও পারস্পরিক কল্যাণ কামনার দিন। বাংলা সনের প্রথম মাসের প্রথম দিনটি হলো বাংলা নববর্ষের দিন। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় দিনটি আমরা উদযাপন করি। বর্তমানে আমরা যেভাবে বৃহৎ পরিসরে আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করি, পাকিস্তান আমলে এমনটি ছিল না। ‘পাকিস্তানি আদর্শের পরিপন্থী’— এই অজুহাতে তখন বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষকে উদযাপন করতে দেওয়া হয়নি।

১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বাংলা নববর্ষের ছুটি ঘোষণা করলেও পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন জারি হওয়ার কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে রমনার বটমূলে নববর্ষ উদ্যাপনের শুরুটা করেছিল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট, ১৯৬৭ সালে। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বাধাহীন পরিবেশে আমরা এখন নববর্ষ উদযাপন করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে এই অনুষ্ঠান শুরু হয় । এই শোভাযাত্রায় মুখোশ, কার্টুনসহ আবহমান বাঙালির পরিচয় বহনকারী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকধর্মী চিত্র বহন করা হয়।

বাংলা সনের সুস্পষ্ট কোনো ইতিহাস এখনো জানা যায়নি, তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতের ধারণা- মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। বাংলা সন প্রবর্তিত হওয়ার পর নববর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয় নানা আনুষ্ঠানিকতা, জমিদার শ্রেণি চালু করে ‘পুণ্যাহ’। এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য খাজনা আদায় হলেও এদিন সাধারণ প্রজাদের মিষ্টি পান-সুপারি ইত্যাদির দ্বারা আপ্যায়ন করা হতো। ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষকেরা ফসলের ওপর নির্ভরশীল। নগদ টাকার অভাবে তাঁরা সারা বছর ব্যবসায়ীদের থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাকিতে নিত এবং ফসল উঠলে তা পরিশোধ করত। এ দিন ব্যবসায়ীরা দোকান সাজাতেন বিভিন্ন রঙের শৌখিন কাগজ দিয়ে এবং গ্রাহক-খরিদ্দারদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এখনো এই প্রথা অল্প পরিসরে হলেও প্রচলিত রয়েছে। বাংলা নববর্ষের প্রধান আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান হলো বৈশাখী মেলা।

দেশের বিভিন্ন স্থানে যুগ যুগ ধরে এসব মেলা আয়োজিত হয়ে আসছে। যেমন— ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদের মেলা ও চট্টগ্রামের মহামুনির বুদ্ধপূর্ণিমা মেলা। মেলায় থাকত কবিগান, কীর্তন, যাত্রা, গম্ভীরা গান, পুতুলনাচ, নাগরদোলাসহ নানা আনন্দ আয়োজন। নানা ধরনের খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যেত এখানে। এছাড়াও সামাজিক মেলবন্ধনের স্থানও ছিল এসব মেলা। ওপরে বর্ণিত তিন ধরনের অনুষ্ঠান ছাড়াও বাংলাদেশে প্রচলিত আছে বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক অনুষ্ঠান।

চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানের বিখ্যাত ‘জব্বারের বলী খেলা’ তথা কুস্তি খেলা এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা উদ্‌যাপন করে ‘বৈসাবি’। মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড়, হাড়ড় খেলা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোরগের লড়াই; কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, নড়াইলের ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদিও বিখ্যাত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তি ঘটে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে বাংলা নববর্ষ। বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ উৎসবের কেন্দ্র। ফুলে-রঙে, মুখোশে-ব্যানারে-ফেস্টুনে, বাঁশির সুরে-সংগীতে বসন্তের নির্মল বাতাসে উদ্‌বেলিত হয় বাঙালির হৃদয়। বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণে এনে দেয় নতুন ও রঙিন প্রাণের স্পৃহা।


৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৫ম পরিচ্ছেদ বড় প্রশ্ন

প্রশ্ন ০১: ‘বাংলা নববর্ষ’ প্রবন্ধটি পড়ে বুঝে নিয়ে দুটি দলে ভাগ হও। এরপর প্রবন্ধটি কেমন বুঝতে পেরেছ তা যাচাই করার জন্য একদল আরেক দলকে নিচের প্রশ্নগুলো করো এবং উত্তর দাও।
ক. বাংলা নববর্ষ কোন মাসের কোন তারিখে উদযাপন করা হয়?
উত্তর: বাংলা সনের বৈশাখ মাসের পয়লা তারিখে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়।

খ. পাকিস্তানি আমলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে দেওয়া হয়নি কেন?
উত্তর: পাকিস্তানি আদর্শের পরিপন্থী বলে পাকিস্তানি আমলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে দেওয়া হয়নি।

গ. বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে ১৯৫৪ সাল গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বাংলা নববর্ষের ছুটি ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। সেটা ছিল বাঙালির এক তাৎপর্যপূর্ণ বিজয়ের দিন। তাই বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে ১৯৫৪ সাল এতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ঘ. নববর্ষ উদযাপনে ছায়ানটের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: পাকিস্তানি আমলে সরকারিভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়নি; কিন্তু বেসরকারিভাবে উদযাপিত হয়েছে প্রবল আগ্রহ ও গভীরতর উৎসাহ-উদ্দীপনায়। এর মধ্যে সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে ছায়ানট নববর্ষের উৎসব শুরু করে।

ঙ. ঢাকার নববর্ষ উৎসবের দ্বিতীয় আকর্ষণ কী এবং কেন?
উত্তর: ঢাকার নববর্ষ উৎসবের দ্বিতীয় প্রধান আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় মুখোশ, কার্টুনসহ যেসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকধর্মী চিত্র বহন করা হয়, তাতে আবহমান বাঙালিত্বের এবং সমকালীন সমাজ-রাজনীতির সমালোচনাও থাকে।

প্রশ্ন ০২: ‘হালখাতা’ কী? ‘বাংলা নববর্ষ’ প্রবন্ধটি পড়ে হালখাতা সম্পর্কে যা জানতে পেরেছ তা লেখো।
উত্তর: হালখাতা আবহমান বাংলার একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। বছরের শুরুতে দোকানে পুরোনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন হিসাব খোলার যে আয়োজন করা হয়, তাকে হালখাতা বলে।

“বাংলা নববর্ষ’ প্রবন্ধটি পড়ে আমি যা জানতে পেরেছি, তা হলো আগে গ্রামবাংলার কৃষকদের কাছে নগদ অর্থ তেমন বেশি থাকত না। ফলে তাদের প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস বাকিতে কিনতে হতো। বছর শেষে ফসল বিক্রি করে দোকানের পাওনা মেটাতেন তাঁরা। আগের বছরের পুরো বা আংশিক বাকি টাকা জমা দিয়ে তাঁরা নতুন হিসাব খুলতেন। দোকানিরা এই দিনকে উৎসবের মতো করে উদযাপন করতেন। বর্তমানে নগদ লেনদেন বেশি হওয়ার কারণে হালখাতার উৎসব প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন ০৩: ‘বাংলা নববর্ষ’ রচনাটিকে প্রবন্ধ কেন বলব? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: ‘বাংলা নববর্ষ’ রচনাটি পড়ে আমরা বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারি। এখানে পহেলা বৈশাখে বাঙালির চিরাচরিত অনুষ্ঠানগুলোর বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি নববর্ষের রাজনৈতিক দিকগুলো উঠে এসেছে। রচনাটি পড়ে আমরা পুণ্যাহ, হালখাতা, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের বিবরণ জানতে পেরেছি। নাতিদীর্ঘ কলেবরে বাংলা নববর্ষের অন্যান্য অনুষ্ঠানের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। তথ্য বর্ণনা করতে লেখক নিজের সৃজনশীলতার পরিচয় রেখেছেন। রচনাটি একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে। একটি আদর্শ প্রবন্ধের সকল বৈশিষ্ট্য বিরাজমান থাকায় বাংলা নববর্ষ’ রচনাটিকে আমরা প্রবন্ধ বলব।

প্রশ্ন ০৪: একটি প্রবন্ধ লেখার সময় তোমাকে কী কী বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে হবে তা বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রবন্ধ হলো এমন এক ধরনের গদ্য রচনা যা পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণাকে পরিতৃপ্ত করে। প্রবন্ধ রচনার সময় আমাকে নিম্নে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলো অনুসরণ করতে হবে।
ক. প্রবন্ধ অবশ্যই গদ্য ভাষায় রচিত হতে হবে।
খ. প্রবন্ধে লেখকের সৃজনশীলতার পরিচয় থাকতে হবে।
গ. প্রবন্ধ নাতিদীর্ঘ আকারে লিখিত হবে।
ঘ. পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাবে।
ঙ. প্রবন্ধে অনেক ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ ও বিবরণ থাকবে।
চ. সাহিত্য যেভাবে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে ও মানুষকে আনন্দ দেয়, প্রবন্ধও তেমন হতে হবে।

প্রশ্ন ০৫: প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্যগুলো অনুসরণ করে যেকোনো বিষয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা করো।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

ঐতিহ্যের বাঙালি জাতি। এ কথা বলাটা সন্দেহাতীতভাবে যৌক্তিক। এ জাতির ভান্ডারে যেমন রয়েছে বিচিত্র জাতিসত্তার পরিচয়, তেমনি অনুষ্ঠানাদি পালনেও রয়েছে মাতন্ত্র্য। বহুকাল থেকে বাঙালির নতুন বছরকে বরণ করার ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন মহা উৎসবে মেতে ওঠে এ জনপদের মানুষ নানা কর্মসূচি এ দিনকে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে। পহেলা বৈশাখ মানেই যেন ভিন্ন এক আমো, ভিন্ন অনুভূতি। একসময় হালখাতা, পুণ্যাহ, ভিন্ন ও | বৈচিত্র্যময় খাবারের আয়োজন হতো নতুন বছর উপলক্ষ্যে। শহর ও গ্রামের মানুষেরা নতুন পোশাক পরিধান করে বিভিন্ন মেলায় ঘুরে বেড়াতেন। তবে দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখের উৎসব উদযাপনে ভিন্নতা এসেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা তেমনি একটি আয়োজনের নাম।

নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। একসময় এর নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। রংবেরঙের চিত্রকর্ম ও গ্ল্যাকার্ড শোভা পায় এই শোভাযাত্রায়। বাঙালির সংস্কৃতির নানা দিক ফুটে ওঠে মঙ্গল শোভাযাত্রায় নামের মাঝেই এর উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। মাল বা কল্যাণ কামনার উদ্দেশ্যে এই আয়োজন করা হয়ে থাকে। অশুভ শক্তির বিনাশ সাধন করে শুভ বা কল্যাগের আগমনের প্রত্যাশায় এ শোভাযাত্রা বের করা হয়।

প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা এ বর্ণাঢ্য আয়োজন সফল করতে নতুন নতুন উপস্থাপনা নিয়ে হাজির হন। একটি বিষয় নির্ধারণ করে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্রকর্ম তৈরি করা হয়। চিত্র, মুখোশ ও নানা প্রতীকে ফুটিয়ে তোলা হয় প্রতিপাদ্য বিষয়কে। অশুভের বিনাশ কামনা করে সত্য ও সুন্দরের আহ্বান তুলে ধরা হয় শোভাযাত্রাটিতে।

১৯৮৫ সালে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয় যশোর থেকে। চারুশিল্পী মাহবুব জামাল শামীমের উদ্যোগে এটি বের করা হয়েছিল। তখন দেশে সামরিক শাসন চলছিল। গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হয়ে স্বৈরশাসন জাতির জন্য অভিশাপম্বরূপ ছিল। সেখান থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে সেসময় এমন শোভাযাত্রার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। যদিও তখন এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। সেদিন এর মূলভাব ছিল ‘অগণতান্ত্রিক শক্তির বিনাশ”।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন এই শোভাযাত্রায়। এখন প্রতিবছরই চারুকলার সামনে থেকে এটি বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ১৯৮৯ সালের শোভাযাত্রায় স্থান পায় পাপেট ঘোড়া ও হাতি। ১৯৯০ সালে ছিল নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি। ১৯৯১ সালের শোভাযাত্রা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এতে চারুকলার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিল্পীরা অংশ নেন। মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন আর বাঙালি জাতির উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বর্ণাঢ্যতা, গুরুত্ব ও আয়োজনের পরিসর দেশ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। বাঙালি জাতি যে ঐতিহ্যের জাতি তা এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়। যদিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভিপ্রায়ে এই আয়োজনের সূচনা করা হয়নি। কিন্তু নববর্ষের প্রথম দিনকে এমন জমকালোভাবে উদযাপন সম্ভবত বিশ্বে বিরল ঘটনা। ঢাক, অসংখ্য মুখোশ খচিত নববর্ষের মিছিল ও নাচ-গানের অনন্য নিদর্শন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদেরও ভাবাতে বাধ্য করেছে। ফলে বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা সাড়া দেন। তাঁরা দেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউটের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও শিল্পীরা নিঃস্বার্থভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোগ নেন।

কোনো পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ না করে নিজেদের চিত্রকর্ম বিক্রির টাকায় তারা বিভিন্ন মুখোশ, মূর্তি, টেপা পুতুল, নকশি পাখি, প্রাণীর প্রকৃতি তৈরি ও রং-তুলিতে সজ্জিত করেন। তাঁদের এমন সর্বজনীন আয়োজনে স্থান পায় ঘোড়া, নকশি পাখা, ফুল, প্রজাতি, মানুষ প্রভৃতি। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ। মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি জাতির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। আমরাও পারি নববর্ষের উৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দ্রোহ প্রকাশ করতে। আমাদের শোভাযাত্রা কোনো সাধারণ মিছিল নয়, অসত্য, অসুন্দরের মূলোৎপাটন করে সত্য ও সুন্দর প্রতিষ্ঠাই আমরা ধ্বনিত করি। জয় হোক সেই সত্যের।


আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ১ম পরিচ্ছেদ – কবিতা
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ২য় পরিচ্ছেদ – ছড়া
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৩য় পরিচ্ছেদ: গান
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৪র্থ পরিচ্ছেদ – গল্প


আশাকরি “৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৫ম পরিচ্ছেদ” আর্টিকেল টি আপনাদের ভালো লেগেছে। আমাদের কোন আপডেট মিস না করতে ফলো করতে পারেন আমাদের ফেসবুক পেজ ও সাবক্রাইব করতে পারেন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল।