|

৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৪র্থ পরিচ্ছেদ – গল্প

৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৪র্থ পরিচ্ছেদ: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত নানা ঘটনা ঘটে থাকে। এসব ঘটনা ছোটো পরিসরে অন্যের কাছে উপস্থাপনের কথ্য বা লিখিত কৌশলই হচ্ছে গল্প। বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে কল্পনাকে জড়িয়ে গল্প রচিত হয়। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় নবীনতম সদস্য হচ্ছে ‘ছোটোগল্প’ যা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা সাহিত্যে যুক্ত হয়েছে। গল্প পড়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের নানা ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারি। গল্প লেখার কিছু নিয়ম ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অনুসরণ করে যেকেউ গল্প লিখতে পারে।

পাঠ বিশ্লেষণ

পাঠের উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীদের ছোটো গল্প সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি গল্প লিখতে পারদর্শী করে তোলা।
নামকরণ: পরিচ্ছেদটি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গল্প সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবে। এখানে গল্প লিখার কৌশল, গল্পের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সেই বিবেচনায় পরিচ্ছেদটির নাম ‘গল্প’ সার্থক হয়েছে।

আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির শিল্প ও সংস্কৃতি সকল অধ্যায় এর সমাধান


‘তোলপাড়’ গল্পের প্রাসঙ্গিক আলোচনা

লেখক সম্পর্কিত তথ্য: লেখক শওকত ওসমান ১৯১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তবে অধ্যাপনা জীবনে প্রবেশ করার আগে তাঁর চাকরিজীবন ছিল বিচিত্র। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে আছে— ‘জননী’, ‘ক্রীতদাসের হাসি’, ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’;

শিশুতোষ রচনা: ‘ওটন সাহেবের বাংলো’, ‘ডিগবাজি’, ‘মসকুইটো ফোন’, ‘তারা দুইজন’, ‘ক্ষুদে সোশালিস্ট’ ‘ছোটোদের নানা গল্প’, ‘কথা রচনার কথা’, ‘পঞ্চসঙ্গী’ ইত্যাদি। তিনি পুরস্কার ও সম্মাননা হিসেবে পেয়েছেন— আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি। তাঁর প্রকৃত নাম আজিজুর রহমান। তিনি ১৯৯৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

মূলবক্তব্য: মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের অত্যাচারের মাত্রা অনুধাবন করে একজন কিশোর কীভাবে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়— ‘তোলপাড়’ গল্পে তাই ব্যক্ত হয়েছে। গ্রামের ছেলে সাবু বাড়ির সামনের সড়কে শহর থেকে জীবন রক্ষার্থে পালিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষ দেখে স্তম্ভিত হয়। সে দেখতে পায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ-নির্বিশেষে সবাই শহর থেকে পালাচ্ছে। বাঙালিদের পাকিস্তানিরা হত্যা করছে বলে জানা যায়।

পুত্রবধূ ও শিশু-নাতি-নাতনিদের নিয়ে পলায়নপর এক বৃদ্ধ আক্ষেপ করে বলেন, ইসলামের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে সেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে পুত্রদের হারাতে হলো। মানুষের প্রতি হানাদার বাহিনীর এই নিষ্ঠুরতা অনুভব করে কিশোর সাবু ক্ষুব্ধ হয়। পাকিস্তানিদের প্রতি তার ঘৃণা বাড়তে থাকে। তাদের মোকাবিলা করার জন্য তার কিশোর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে।

পাঠ বিশ্লেষণ

পাঠের উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করা এবং শিক্ষার্থীদের গল্প পড়তে, বুঝতে ও লিখতে পারদর্শী করে তোলা।
নামকরণ: গল্পটি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে। এ গল্পে গ্রামের ছেলে সাবু সাধারণ মানুষের প্রতি হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা অনুভব করে ক্ষুব্ধ হয়। তাদের প্রতি প্রতিশোধ নিতে তার মনের মধ্যে এক ধরনের তোলপাড় শুরু হয়। সেই বিবেচনায় রচনাটির নাম ‘তোলপাড়’ রাখা সার্থক হয়েছে।
রূপশ্রেণি: ‘তোলপাড়’ একটি গল্প।


‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পের প্রাসঙ্গিক আলোচনা

লেখক সম্পর্কিত তথ্য: হালিমা খাতুন ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে বাগেরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন; এজন্য তাঁকে ভাষাসৈনিক বলা হয়। তিনি শিশুদের জন্য বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা ৩০টির বেশি।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে— ‘পাখির ছানা’, ‘পিকনিকে’, পালিয়ে’, ‘ছাগল ছানার গল্প’, ‘কুমিরের বাপের শ্রাদ্ধ’ প্রভৃতি। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ২০১৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। তিনি ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

মূলবক্তব্য: দশ বছরের ছেলে আবুর খুব ইচ্ছা বর্ষার বৃষ্টিঝরা রাতে বড়ো ভাইদের সঙ্গে বিলে মাছ ধরতে যাবে। কিন্তু ছোটো বলে তারা আবুকে সঙ্গে নিতে চায় না। তাই মাছ ধরতে যাওয়ার দিন আবু আগেই নৌকার খোলে লুকিয়ে রইল। একপর্যায়ে আবু ধরা পড়লেও তাকে শেষপর্যন্ত সঙ্গে নেওয়া হয়। দেখা যায়, সে মাছ ধরার জন্য অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে তেলাপোকাও নিয়ে এসেছে। এ নিয়ে বড়োরা বেশ হাসি-তামাশা করে। বিলে গিয়ে আবুকে নৌকায় রেখে সবাই মাছ ধরতে চলে গেলে সে বড়শি ফেলে অপেক্ষা করতে থাকে।

অবশেষে নানা কৌশলে আবু বড়ো একটা মাছ ধরে ফেলে। বড়ো ভাইয়েরা অবশ্য সে-রাতে পুঁটিমাছ ছাড়া আর কোনো মাছই ধরতে পারেনি। তারা নৌকায় বিশাল আকৃতির বোয়াল মাছ দেখে অবাক হয়ে যায়। বয়সে ছোটো বলে কাউকে অবহেলা করতে নেই, কিংবা বয়সে বড়ো হলেই কোনো কাজে কেউ সফলতা লাভ করবে, তা-ও নয়— গল্পটিতে এই সত্য ধরা পড়েছে।

পাঠ বিশ্লেষণ

পাঠের উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীদের বয়সে ছোটো এমন কাউকে অবহেলা না করার গুরুত্ব অনুধাবন করানো এবং শিক্ষার্থীদের গল্প পড়তে, বুঝতে ও লিখতে পারদর্শী করে তোলা।
নামকরণ: পরিচ্ছেদটি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আযাঢ়ের এক রাতে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে। সেই বিবেচনায় রচনাটির নাম “আষাঢ়ের এক রাতে’ রাখা সার্থক হয়েছে।
রূপশ্রেণি: ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ একটি গল্প।


গল্প

কাহিনি বলার জন্য লেখক গদ্য ভাষায় যে রচনা তৈরি করেন, তাকে গল্প বলে। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত নানা ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা ছোটো পরিসরে অন্যের কাছে উপস্থাপনের কথ্য বা লিখিত কৌশলই হচ্ছে গল্প। ‘গল্প’ কথাটি সংস্কৃত ‘জল্প’ শব্দ থেকে এসেছে। বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে কল্পনাকে জড়িয়ে গল্প রচিত হয়।

গল্প আয়তনে সাধারণত ছোটো হয়ে থাকে। তবে বড়ো আয়তনের গল্পকে বলে উপন্যাস। প্রতিটি গল্পের মধ্যে কাহিনি থাকে। গল্পের কাহিনি গড়ে ওঠে কিছু চরিত্রের মধ্য দিয়ে। গল্পের চরিত্র অনেক সময়ে কথা বলে, সেসব কথাকে সংলাপ বলা হয়। যিনি গল্প লেখেন তিনি গল্পকার। গল্প নানা ধরনের হতে পারে। যেমন- সামাজিক, প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কে, অতি প্রাকৃত কাহিনি, প্রেমবিষয়ক, হাস্যরসাত্মক, উদ্ভট কল্পনাশ্রয়ী ইত্যাদি।

গল্পের বৈশিষ্ট্য

  • গল্পে কাহিনি ও চরিত্র থাকে।
  • গল্পের কাহিনি বাস্তবজীবন থেকে নেওয়া যেতে পারে আবার কল্পিতও হতে পারে।
  • গল্পের পরিধি ছোটো হয়।
  • একটিমাত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে গল্প আবর্তিত হয়।
  • গল্পে শাখাকাহিনি বা উপকাহিনি স্থান পায় না।
  • ছোটোগল্প শেষ হয় নাটকীয়ভাবে। গল্প পড়া শেষে পাঠকের মনে অতৃপ্তি রয়ে যাবে।
  • চরিত্র সংখ্যা অনেক হবে না।
  • পুরো জীবনের ঘটনা উঠে আসবে না। টুকরো কোনো ঘটনা নিয়ে গল্প লেখা হবে।
  • গল্প যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়, তেমনি হঠাৎ করে শেষও হয়ে যায়।

গল্প লেখার সহজ কৌশল

  • লেখা নাটকীয়ভাবে শুরু করা।
  • বিস্তারিত কাহিনি বর্ণনা না করে কেবল মূল ঘটনা বর্ণনা করা।
  • ঘটনার বিন্যাসে শাখা-প্রশাখা না রাখা।
  • সহজ-সাবলীল এবং প্রাঞ্জল ভাষা ব্যবহার করা।
  • চরিত্র অনুযায়ী মানানসই সংলাপ ব্যবহার করা।
  • গল্পে কৌতূহল তৈরি ও আত্মতৃপ্তিসূচক পরিণতি বজায় রাখা।

পাঠ মূল্যায়ন

প্রশ্ন-১. কোনো ঘটনা ছোটো পরিসরে অন্যের কাছে উপস্থাপনের লিখিত কৌশলকে কী বলে?
উত্তর: ছোটো গল্প।

প্রশ্ন-২. বড়ো আয়তনের গল্পকে কী বলে?
উত্তর: উপন্যাস।

প্রশ্ন-৩. ‘গল্প’ কথাটি কোন শব্দ থেকে এসেছে?
উত্তর: সংস্কৃত ‘জল্প’ শব্দ থেকে।

প্রশ্ন-৪. যিনি গল্প লেখেন তাঁকে কী বলে?
উত্তর: গল্পকার।

প্রশ্ন-৫. ছোটো গল্প বাংলা সাহিত্যে যুক্ত হয়েছে কখন?
উত্তর: উনিশ শতকের মাঝামাঝি।


তোলপাড় ও আষাঢ়ের এক রাতে গল্প থেকে প্রশ্ন

১. ‘তোলপাড়’ গল্পটি নিজের ভাষায় বলো এবং লেখো।
উত্তর: সাবু তার মা জৈতুন বিবিকে একদিন বিকেলে হস্তদন্ত হয়ে খবর দেয় যে, ঢাকা শহরে পাঞ্জাবি মিলিটারিরা সব মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলছে। ২৫ মার্চ রাতে এই হত্যাকাণ্ড শুরু করেছে। জীবিত মানুষ দেখলেই গুলি করছে। সাবুদের গ্রামের নাম গাবতলি, যা শহর থেকে ৫০ মাইল দূরে, এই গ্রামের পাশ দিয়ে জেলা বোর্ডের সড়ক চলে গেছে। শহর ছেড়ে পালানো হাজার হাজার মানুষ হেঁটে চলেছে কুমিল্লা, নোয়াখালী; ময়মনসিংহসহ নানা গন্তব্যে।

তীব্র রোদে এত পথ হেঁটে পাড়ি দেওয়ায় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সাবুর মা নিজেদের কথা না ভেবে ক্লান্ত মানুষগুলোর জন্য মুড়ি ডেজে পাঠিয়েছেন সাবুকে দিয়ে। মুড়ি খাওয়া শেষ হলে সাবু তাদের পানি এগিয়ে দিয়েছে। একজন বৃদ্ধ নারী সাবুর কাজে খুশি হয়ে তাকে কিছু পয়সা দিতে চাইলেন, কিন্তু সাবু কিছুতেই তা নিতে রাজি হয়নি। বৃদ্ধমহিলা সাবুকে তাঁর ঠিকানা দিলেন, শহরে গেলে সাবু যেন তাঁর বাড়িতে যায়— এই বলে নিজে ভিড়ের মাঝে মিশে গেলেন। সেই ভিড়ে ধনী-গরিব সব মানুষই আছে। একদিন সত্তর বছরের একজন বৃদ্ধ তার তিন পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে গাবতলি গ্রাম পাড়ি দিলেন। বৃদ্ধের তিন ছেলেকেই পাকিস্তানি আর্মি মেরে ফেলেছে।

সাবু ও গ্রামের অন্যরা বিভিন্নভাবে সাহায্য করে সেই পরিবারটিকে নদীর ধারে পৌঁছে দিল। বৃদ্ধ অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, তারাই তাঁর ছেলে। একজন ধর্মভীরু মানুষ হিসেবে তিনি ভেবেছিলেন পাকিস্তান হলে মুসলমানদের ভালো হবে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে এখন কেবল দীর্ঘশ্বাস। দেশের হাজারো মানুষের এই দুঃখগাথা সাবুর মনে একধরনের ক্রোধের জন্ম দেয়, পাকিস্তানি আর্মির প্রতি ঘৃণা ও আক্রোশ তৈরি হয় তার মনে। যারা তার দেশের মানুষকে মানুষ মনে করে না, সেইসব জানোয়ারকে মোকাবিলা করার জন্য তার কিশোর মনে শুরু হয় এক আশ্চর্য তোলপাড়।

২. ‘তোলপাড়’ গল্পের সঙ্গে তোমার জীবনের বা চারপাশের কোনো মিল খুঁজে পাও কি না, কিংবা কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাও কি না, তা নিচে লেখো।
উত্তর: ‘তোলপাড়’ গল্পের সাবুর মতো আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েও একটি বড়ো সড়ক চলে গেছে। আমাদের গ্রামেও কেউ বিপদে পড়লে সবাই মিলে তাকে সাহায্য করে। কারো বাড়িতে খাবার না থাকলে আমাদের রান্না করা খাবারের কিছু অংশ তাদের দিয়ে আসি। তোলপাড় গল্পে একজন প্রৌঢ় নারীকে সাবু পানি খাইয়েছিল। আমাদের বাড়ির পাশেই একজন বৃদ্ধা থাকেন। তাঁকে আমি প্রায়ই বাজার থেকে জিনিসপত্র এনে দিই। গ্রামের অন্য একজন নারী তাঁকে রান্নার কাজে সহায়তা করেন। এভাবে আমরা তাঁর খেয়াল রাখি।

৩. ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পটি নিজের ভাষায় বলো এবং লেখো।
উত্তর: আকাশে তখন বিদ্যুতের ঝলকানি, মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন, আষাঢ়ের এমন এক বৃষ্টিমুখর দিনে বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে মৌরী বিলে মাছ ধরতে গিয়ে আবু বিশাল এক বোয়াল মাছ ধরেছিল। বর্ষাকালে মৌরী বিলে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। আবুর বড়ো ভাই সাজেদ তার বন্ধুদের নিয়ে মাছ ধরতে যায়। কিন্তু আবু ছোটো হওয়ার কারণে তাকে কখনো সঙ্গে নেয় না। সেদিন সাজেদ ও তার বন্ধুরা মাছ ধরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

আবু তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য নৌকার পাটাতনের নিচে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মাছ ধরতে যাচ্ছে সাজেদ, তার বন্ধু বিপুল ও বায়েজিদ আর নৌকা বাওয়ার জন্য কিষান তিনু। তারা সঙ্গে নিয়েছে হারিকেন, কয়েক ধরনের জাল ও রাতের খাবার। সন্ধ্যার আগেই তারা রওনা হয়ে গেল মৌরী বিলের উদ্দেশে। একটু পরেই শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টিতে হারিকেন প্রায় নিডে গেলে, পাটাতনের নিচে রাখা কেরোসিনের বোতল আনতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করল আবু সেখানে ঘুমিয়ে আছে। আবুকে জাগিয়ে কিছুক্ষণ নিন্দামন্দ ও উপহাস করে, তিনুর জিম্মায় নৌকাতে আবুকে রেখে সাজেদ তার বন্ধুদের নিয়ে চলে গেল মাছ ধরতে। টিনের আংটা দিয়ে বড়শি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আবু, সঙ্গে টোপ হিসেবে তেলাপোকা।

দুটো বড়শিতে তেলাপোকার টোপ গেঁথে পানিতে ফেলে দিয়ে আবু নৌকায় বসে রইল। আবু শুনেছিল বোয়াল মাছ তেলাপোকা ভালোবাসে। হঠাৎ আবুর বড়শির শলা নিচের দিকে চলে গেল, টান পড়ল ছিপের রশিতে। তিনুর সাহায্যে আবু ছিপ ধরে রাখল, একটু পরে একটি মাছ ধরল তারা। বিজলির আলোয় দেখতে পেল, একটি বোয়াল মাছ, যার সাইজ অনেকটা আবুরই মতন। এদিকে সাজেদরা কোনো বড়ো মাছ ধরতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে এলো। এসে বোয়াল মাছ দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। এত বড়ো বোয়াল কে ধরল জানতে চাইলে আবু বলল সে ধরেছে।

৪. ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পের সঙ্গে তোমার জীবনের বা চারপাশের কোনো মিল খুঁজে পাঁও কি না, কিংবা কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাও কি না, তা নিচে লেখো।
উত্তর: ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পের মতো আমাদের বাড়ির পেছনেও একটি বিল রয়েছে। বর্ষার শেষে পানি কমে গেলে সেখানে নানা ধরনের মাছ ধরা পড়ে। বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরতে হয়। পানি বেশি থাকলে রাতের বেলায় বড়শিতে টোপ দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় সকালে গিয়ে মাছ নিয়ে আসা যায়। আবার ‘আষাঢ়ের এক রাতে গল্পের আবুর মতো ছোটোবেলায় আমার ওপরেও কেউ ভরসা করতে চাইত না। ধীরে ধীরে তাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে।


৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৪র্থ পরিচ্ছেদ বড় প্রশ্ন

প্রশ্ন ০১: কোনো গল্প বলতে হলে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়?
উত্তর: একটি গল্পের নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ থাকতে হয়—
ক. গল্পের কাহিনি ও চরিত্র থাকতে হবে।
খ. গল্পের কাহিনি বাস্তবজীবন ভিত্তিক হতে পারে আবার কল্পিতও হতে পারে।
গ. গল্পে একটিমাত্র বিষয় বা প্লট থাকে।
ঘ. চরিত্রের সংখ্যা কম হতে হবে।
ঙ. গল্পের মধ্যে কোনো উপকাহিনি স্থান পায় না।

প্রশ্ন ০২: এই গল্পের সঙ্গে কবিতার মিল ও অমিল কী?
উত্তর: গল্পের সঙ্গে কবিতার মিল ও অমিলসমূহ নিম্নরূপ:
গল্প ও কবিতার মিল: গল্পে একজন লেখকের চিন্তা ও অনুভূতিগুলোর সুস্পষ্ট রূপ প্রকাশ পায়। কবিতাতেও একই ঘটনা ঘটে। কবিতার মতো গল্পও হয় সংক্ষিপ্ত।
গল্প ও কবিতার অমিল: কবিতায় ছন্দের ব্যবহার করা হয়, গল্পে তা হয় না। সাধারণ কবিতা গল্পের চেয়েও সংক্ষিপ্ত হয়। গল্পের ভাষা হয় সরল, অপরদিকে কবিতার ভাষা হয় কাব্যিক।

প্রশ্ন ০৩: কোন ধরনের গল্প পড়তে তোমার ভালো লাগে? কেন ভালো লাগে তা লেখো।
উত্তর: আমার ডিটেকটিভ বা গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালো লাগে। গোয়েন্দা গল্পে অকুতোভয় গোয়েন্দারা বিভিন্ন রহস্যের সমাধান বের করে আনেন। তাঁদের অভিযানের কাহিনি পড়ে আমার ভেতরেও রোমাঞ্চ কাজ করে। এজন্য ডিটেকটিভ বা গোয়েন্দা গল্প আমার ভালো লাগে।

প্রশ্ন ০৪: প্রদত্ত শব্দগুলোর অর্থ লেখো। অসোয়াস্তি, কুঁচো, কাফেলা, জয়িফ, প্রৌঢ়।
উত্তর: অসোয়াস্তি— খারাপ লাগা; কুঁচো – ছোটো; কাফেলা— পথিকের দল; জয়িফ – অতি বৃদ্ধ; প্রৌঢ় – মধ্যবয়সি।

প্রশ্ন ০৫: ‘তোলপাড়’ গল্পটি পড়ে বুঝে নিয়ে দুটি দলে ভাগ হও। এরপর গল্পটি কেমন বুঝতে পেরেছ তা যাচাই করার জন্য একদল আরেক দলকে নিচের প্রশ্নগুলো করো এবং উত্তর দাও।
ক. ‘তোলপাড়’ গল্পটি কোন সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত?
উত্তর: গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত।

খ. পঁচিশে মার্চের রাতে কী ঘটেছিল?
উত্তর: পঁচিশে মার্চের রাতে পাঞ্জাবি বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা চালিয়েছিল। যাকে যেখানে জীবন্ত পাচ্ছিল, গুলি করে হত্যা করছিল।

গ. পলায়নরত মানুষদের সাবু কীভাবে সাহায্য করছিল?
উত্তর: পলায়নরত মানুষের সাবু মুড়ি খাইয়ে ও পানি দিয়ে সাহায্য করেছিল।

ঘ. ‘তোলপাড়’ গল্পটির প্রধান বিষয় কী?
উত্তর: পঁচিশে মার্চের গণহত্যা শুরু হলে ঢাকার মানুষ যখন ঢাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে নানা দুর্দশা ও সংকটে পড়ে তা-ই গল্পের প্রধান বিষয়।

ঙ. সাবুর বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় কেন?
উত্তর: পাঞ্জাবি মিলিটারির মোকাবিলা করার জন্য সাবুর বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। কেননা, ওরা জানোয়ার, ওরা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি জুলুম করেছে; যাকে যেখানে পাচ্ছে গুলি করে হত্যা করছে। ভীত হয়ে, প্রাণের মায়ায় নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ সকলে ঘরহীন হয়ে পালাচ্ছে অজানার উদ্দেশ্যে। তাই ক্রোধে ও আক্রোশে সাবুর বুকে তোলপাড় শুরু হয়।

প্রশ্ন ০৬: তোমার লেখা রচনাটি গল্প কিনা তা তুমি কীভাবে বুঝবে? গল্পের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাও।
উত্তর: আমার লেখা রচনাটি একটি গল্প। কারণ একটি গল্পের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকতে হয় তার সবকটিই আমার গল্পে রয়েছে। রচনাটি একটি বিষয়ে কেন্দ্র করে লিখিত হয়েছে। একটি সুনির্দিষ্ট কাহিনি আছে এবং রচনাটির আয়তন ছোটো। রচনাটির চরিত্র সংখ্যা কম এবং মানানসই সংলাপের ব্যবহার হয়েছে। তাই আমার লেখা রচনাটি একটি গল্প।

প্রশ্ন ০৭: তুমি কি কখনো অন্যকে সাহায্য করেছ? অন্যকে সাহায্য করলে মনে কী ধরনের বোধ তৈরি হয়?
উত্তর: আমি সুযোগ পেলেই অন্যকে সাহায্য করে থাকি। একবার একজন বৃদ্ধ চাচাকে সাহায্য করেছিলাম, বাজার করে বাড়ি ফেরার সময় ভারী ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যেতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। আমি কিছু জিনিস তাঁর কাছ থেকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলাম। তিনি হুব খুশি হয়েছিলেন। অন্যকে সাহায্য করতে পারলে মনের মধ্যে আনন্দবোধ তৈরি হয়।

প্রশ্ন ০৮: ‘তোলপাড়’ গল্পের মতো আমাদের দেশে যদি আবারও যুদ্ধ শুরু হয়, তুমি কী করবে?
উত্তর: ‘তোলপাড়’ গল্পের মতো যদি আমাদের দেশে আবারও যুদ্ধ শুরু হয়, তবে আমি আমার সাধ্যমতো দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার অবস্থায় থাকে, আমি তাদের সাহায্য করব। আমার নিজ পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিরাপদে রাখার চেষ্টা করব।

প্রশ্ন ০৯: প্রদত্ত শব্দগুলোর অর্থ লেখো। কিযান, খালুই, ফাতনা, মাথাল, হাল।
উত্তর: কিষান – কৃষি-মজুর; খালুই মাছ রাখার ঝুড়ি; ফাতনা— বড়শির সুতায় বাঁধা ভাসমান কাঠি বা শোলা; মাথাল – রোদ-বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানোর জন্য বাঁশ বা পাতা দিয়ে তৈরি টুপি; হাল— নৌকার দিক ঠিক রাখার জন্য বিশেষ বৈঠা।

প্রশ্ন ১০: ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পটি পড়ে বুঝে নিয়ে দুটি দলে ভাগ হও। এরপর গল্পটি কেমন বুঝতে পেরছ তা যাচাই করার জন্য একদল আরেক দলকে নিচের প্রশ্নগুলো করো এবং উত্তর দাও।
ক. ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পটি কোন প্রেক্ষাপটে রচিত?
উত্তর: গল্পটি গ্রামের প্রেক্ষাপটে রচিত।

খ. গল্পের মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: বর্ষা রাতে মৌরী বিলে কয়েকজন কিশোরের মাছ ধরার ঘটনা।

গ. আবু নৌকার খোলের মধ্যে ঢুকে লুকিয়ে শুয়েছিল কেন?
উত্তর: আবু ছোটো বলে রাতের বেলা তাকে মাছ ধরতে বিলে নেওয়া হবে না বলে চুপি চুপি গিয়ে নৌকার খোলের মধ্যে ঢুকে লুকিয়ে শুয়েছিল।

ঘ. আবু ছাড়া আর কে কে বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিল?
উত্তর: আবুর ভাই সাজেদ, বিপুল, বায়েজিদ ও তিন বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিল।

ঙ. মাছ ধরতে সাজেদরা কী কী জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: মাছ ধরতে সাজেদরা সঙ্গে নিয়েছিল কয়েক রকম জাল, হারিকেন, মাছ আনার বড়ো বড়ো খালুই, রাতের খাবার ও অতিরিক্ত দুটো বৈঠা।

প্রশ্ন ১১: একটি গল্প লেখার সময় তোমাকে কী কী বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে হবে তা বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর; একটি গল্প লেখার সময় একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে লিখতে হবে। কাহিনি খুব দীর্ঘ করা যাবে না। গল্পে চরিত্র সংখ্যা কম থাকতে হবে। কাহিনির ভেতরে কোনো উপকাহিনি আনা যাবেনা। গল্পে মানানসই সংলাপ রাখতে হবে। একটি গল্প লেখার সময় এই বিষয়গুলো আমাকে অনুসরণ করতে হবে।

প্রশ্ন ১২: আষাঢ়ের এক রাতে’ রচনাটিকে গল্প কেন বলব? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ রচনাটি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর রচিত। ছোটো একটি ঘটনা নিয়ে এর কাহিনি নির্মিত হয়েছে। এই গল্পের চরিত্রসংখ্যাও কম। এই রচনায় কোনো শাখা কাহিনি বা উপকাহিনি নেই। এখানে আবুর জীবনের পুরো ঘটনা উঠে আসেনি। শুধু আষাঢ়ের সেই রাতে ভাইয়ের সঙ্গে মৌরী বিলে মাছ ধরার ঘটনাটির বর্ণনা আছে। গল্পটি শেষ হয়েছে নাটকীয়ভাবে, যা পাঠকের মনে অতৃপ্তির জন্ম দেয়। আবু বাড়ি ফিরে গেলে কী হয়েছিল তা জানার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। একটি আদর্শ গল্পের সকল বৈশিষ্ট্যই ‘আষাঢ়ের এক রাতে’ গল্পে রয়েছে। তাই এই রচনাটিকে আমরা গল্প বলব।


আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৫ম অধ্যায় ৪র্থ পরিচ্ছেদ – বিশ্লেষণমূলক লেখা
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৫ম অধ্যায় ৫ম পরিচ্ছেদ – কল্পনানির্ভর লেখা
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ১ম পরিচ্ছেদ – কবিতা
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ২য় পরিচ্ছেদ – ছড়া
আরও দেখুন: ৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৩য় পরিচ্ছেদ: গান


আশাকরি “৭ম শ্রেণির বাংলা ৬ষ্ঠ অধ্যায় ৪র্থ পরিচ্ছেদ” আর্টিকেল টি আপনাদের ভালো লেগেছে। আমাদের কোন আপডেট মিস না করতে ফলো করতে পারেন আমাদের ফেসবুক পেজ ও সাবক্রাইব করতে পারেন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল।